মো ফেরদৌস আলম

হল ক্যান্টিন ও দু’টি গল্প

প্রবন্ধ, মতামত
লেখাটি শেয়ার করুন

মো: ফেরদৌস আলম।।

 

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের আবাসিক হলগুলোতে ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগ শিক্ষার্থীদের জীবনধারণের বাস্তবতাকে তুলে ধরে। বিশেষ করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীরা খুব ভালো ভাবেই জানে এসব, কারণ তারাই ভুক্তভোগী। এখানে কিংবদন্তী মোল্লা নাসির উদ্দিনের গল্পে হল ক্যান্টিনের খাবার নিয়ে শিক্ষার্থীদের কিছু অভিযোগের নজির দেওয়ার চেষ্টা করছি।

১.
প্রথম গল্প বলছি নাসির উদ্দিনের অতিথি আপ্যায়ন নিয়ে। একদিন তার এক ফুফাতো ভাইয়ের শ্যালক সঙ্গে একটা বেশ বড় মুরগি নিয়ে তার বাড়িতে এল। অতিথির আনা বড় মুরগিটা দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করলেন নাসির উদ্দিন। দুয়েকদিন বাদে অতিথি বিদায় নিলেও যা নিয়ে এসেছিল তা খেয়েদেয়ে উসুল করে গেল। পরদিন একজন লোক এল মুরগি নিয়ে যে এসেছিল তার ভায়রা পরিচয়ে। নাসির উদ্দিন তাকেও আপ্যায়ন করে বিদায় দিলেন। তারপর দিন আরেকজন লোক এল মুরগি নিয়ে যে এসেছিল তার ভায়রার ভায়রার পরিচয়ে। নাসির উদ্দিন তাকেও খাতির করে খাওয়ালেন। সে যাওয়ার পরদিন আরো একজন লোক এল মুরগি নিয়ে যে এসেছিল তার ভায়রার ভায়রার ভায়রা পরিচয়ে। নাসির উদ্দিন তাকেও স্বাগত জানিয়ে খেতে দিলেন। খেতে গিয়ে প্রথমেই পেলেন মুরগির ঝোল। এক চুমুক দিয়েই কুলি করার ভঙ্গিতে ফেলে দিলেন মাটিতে। বললেন, এ কি ঝোল না ঝাল-লবন পানি! প্রত্যুত্তরে নাসির উদ্দিন হেসে বললেন, জ্বি, এটা প্রথমে যে মুরগিটা এনেছিল সেই মুরগির ঝোলের ঝোলের ঝোল। সেজন্য এরকম লাগছে। এরপর আর কোনো ভায়রার ভায়রার ভায়রা নাসির উদ্দিনের আতিথ্য গ্রহণ করতে আসেনি।

এ গল্পের ঝাল-লবণ পানির সাথে আবাসিক হলগুলোর বিভিন্ন মাছ, গোশত, তরকারির ঝোল সাধারণভাবে তুলনীয়! ডালের ঘনত্বও তাই! অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যেও হালকা হলদে পানিতে ডালের উপস্থিতি নির্ণয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের সন্দেহ ডালের চেয়েও বেশি ঘনীভূত! মনে হয় যেন তারা হল ক্যান্টিনে মোল্লা নাসির উদ্দিন-এর ফুফাতো ভাইয়ের শ্যালকের ভায়রার ভায়রার ভায়রা। অথচ খাবারের মূল্য প্রতিনিয়তই পরিশোধ করতে হচ্ছে। দেখা যায়, মুরগির ঝোল চেয়ে মাছের ঝোল পাওয়া যায়, মাছের ঝোল চেয়ে ডিমের ঝোল, ডিমের ঝোল না থাকলে সাধারণ গরম পানি মিশ্রিত ঝোল! ব্যাপারগুলো অবশ্য সবসময় ঘটে না। তবে প্রায়ই ঘটে বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ।

২.
ভারতবর্ষে একবার নাকি বেড়াতে এসেছিলেন মোল্লা নাসির উদ্দিন। হাঁটতে হাঁটতে তৃষ্ণার্ত নাসির উদ্দিনের মনে পড়ল, এখানকার ফল নাকি খুবই রসালো। রসালো ফল খেয়েই পানির তৃষ্ণা মেটানোর চিন্তা করলেন তিনি। রাস্তার ধারে অনেকের মধ্যে একজন লোককে দেখলেন, এক ঝুড়ি লাল টকটকে ফল বিক্রি করছে। সস্তার বাজারে পাঁচ পয়সায় ফলগুলো পেয়ে গেলেন নাসির উদ্দিন। গাছের ছায়ায় খোশ মেজাজে দু-চারটে খেয়েই তার জিহ্বা, গলা প্রচণ্ড জ্বলতে লাগল। চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকলেও নাসির উদ্দিন একমনে খেতে থাকলেন। একজন পথিক দেখে মোল্লা তার আক্ষেপ জানালো। লোকটা বলল, ওর নাম লঙ্কা! ভারতবর্ষের লঙ্কার নাম কখনও কি শোনোনি? তুমি এক্ষুণি খাওয়া বন্ধ করো, নইলে পেটের জ্বলুনিতে লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়ে মরবে। দেখতে ফলের মতো হলেও এগুলি কিন্তু ফল নয়। নাসির উদ্দিন চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বললেন, আরে ভাই, আমি তো ফল খাচ্ছি না, মনের আনন্দে আমার পয়সা খাচ্ছি!

এভাবে হল ক্যান্টিনে খাবারের বাহারি নামে শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত! ধরুন, মুরগির গোশতের কথা। এর বাহারি নামগুলোর কিছু উদাহরণ দিচ্ছি, যেমন: মুরগি কারি, মুরগি কালা ভুনা, মুরগি রোস্ট, মুরগি ঝাল ফ্রাই, মুরগি ফ্রাই ইত্যাদি! প্রায়ই নামের বাহারে দামের তারতম্যে শিক্ষার্থীরা হতাশ হয়। নাসির উদ্দিন যেমন সরস ভেবে ভুল ফল খেয়ে চোখের পানি ফেলেন, শিক্ষার্থীরাও বাহারি নামের স্বাদ পেতে গিয়ে বোকা বনে যায়। ঝাল ফ্রাইতে ঝালের উপাদান ছাড়া কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। এরকম বিচিত্র অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের অর্জন করতে হয় নিত্য।
পুনশ্চঃ হল ক্যান্টিনকে পরিহাস করা গেলেও ছাত্রাবস্থায় পরিহার করা যাচ্ছে না!
(বিঃ দ্রঃ মোল্লা নাসির উদ্দিনের গল্প সংকলন থেকে উল্লেখ্য গল্প দু’টি আংশিক পরিমার্জন করে নেয়া হয়েছে)


লেখাটি শেয়ার করুন

৫ comments

Leave a Reply