মনির হোসেন

আত্মপরিচয়

অনুগল্প, গল্প
লেখাটি শেয়ার করুন

মনির হোসেন।।

 

রুম থেকে বেড়িয়ে ক্যান্টিনের সামনে আসতেই সহপাঠীরা সবাই চোখ বড় বড় করে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, অনেকের ঠোঁটে আবার তাচ্ছিল্যের হাসি। সিনিয়র ভাইরা যেন সদ্য আবিষ্কার হওয়ার প্রাণীর মতো পর্যবেক্ষন করছে। ক্যান্টিন পার হয়ে পুকুর পাড়ের দোকানে উদ্দেশ্য হাঁটছি, রাস্তায় যাদের সাথে দেখা হচ্ছে সবাই হাসি তামাশার সূরে কিছু না কিছু জিজ্ঞেস করছে। কফির দোকানে গিয়ে কফি চাইতেই দোকানদার মামা একগাল হেঁসে দিলো, কফি শেষ করে দুইটা সিগারেট নিয়ে কার্জনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। সকালের কার্জন বন্ধুদের আড্ডায় মুখরিত থাকে, বিভিন্ন আসরের যারা পরিচিত পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তারা কিছুক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে আবার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ডিপার্টমেন্টের এক বন্ধু তার প্রেমিকার সাথে আড্ডা দিচ্ছিলো। তার পাশে দিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে না চেনার ভান করে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে টিএসসি যাবো, কার্জনের মেইন গেটে গিয়ে রিক্সা ডাকলাম। রিক্সাওয়ালা মামারা আমাকে দেখে কেমন যেন ম্লান মুখ করে আছে, চেহারা দেখে মনে হচ্ছে আমার মতো যাত্রী তারা আশা করে না।রিক্সা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে আছি, পাশে অনেকগুলা রিক্সা থামানো, কোনটা কার রিক্সা বোঝার উপায় নেই। এমন সময় এক ছাত্র এসে বললো,” মামা নীলক্ষেত যাবেন?”

দশমিনিট অপেক্ষা করার পরে আমার ছোটবেলার বন্ধু তার আত্নীয় স্বজন নিয়ে হাজির, সে আসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখতে। আমাকে দেখে যেন তার হৃদকম্পন হাজারগুন বেড়ে গেছে ,কারও সাথে পরিচয় না করিয়ে দিয়ে আমাকে পাশে টেনে নিয়ে বললো,” তুই চলে যা, আমি একা একা ঘুরে দেখে নিবো।”



বারোটায় নবীনদের সাথে সিনিয়রদের পরিচিতি পর্ব তাই তড়িঘড়ি করে ডিপার্টমেন্টের দিকে রওনা হলাম। পরিচিতিপর্বকে উদ্দেশ্য করে সিনিয়র জুনিয়র সবাই খুব সাজগোছ করে এসেছে, সাজানো গোছানো মানুষগুলোর মধ্যে যারা আমার ঘনিষ্ঠ তারা আমাকে দেখে খুবই হতাশ হয়েছে। আবার অনেকে চোখ গরম করে তাকিয়ে আছে আর যারা শুধুই ক্লাসমেট তারা দেখে যেন একটু খুশিই হয়েছে। জুনিয়ররা গ্যালারিতে বসে সিনিয়রদের জন্য অপেক্ষা করতেছে, সিনিয়ররাও প্রস্তুত কিন্তু ঝামেলা বাঁধলো আমাকে নিয়ে, সবাই একমত আমাকে ঢুকতে দিবে না। তাদের মতামত এমন অবস্থায় জুনিয়রদের সামনে গেলে ব্যাচের সবাই আমার জন্য জুনিয়রদের হাশি তামাশার স্বীকার হবে। ব্যাচের সবার রায় মেনে নিয়ে আমি সয়েলের চিপায় গিয়ে নিরবে বসে রইলাম।

একটার সময় ডিপার্টমেন্টের হেডের ক্লাস। ডিপার্টমেন্টের হেড আমেরিকা থেকে পিএইচডিধারী, রুচিসম্মত মানুষ, আভিজাত্যের প্রতি তার অসীম আকাঙ্ক্ষা। তার লেকচারের সময় মাঝেমধ্যে তিনি প্রবাস জীবনের আভিজাত্য স্মৃতিতে হারিয়ে যান, গল্প করেন আমেরিকানদের জীবনধারা নিয়ে, পরামর্শ দেন কিভাবে তাদের মতো হওয়া যায় সে বিষয়ে।
ক্লাসে আমাকে দেখেই স্যার যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। রাগান্বিত স্বরে একেরপর এক ধমক দিয়ে নিজেই আমাকে টেনে ক্লাস থেকে বের করে দিলেন।
সকালে থেকে দুপুর পর্যন্ত মানুষের অপমান, তাচ্ছিল্য আর ঘৃনায় মনটা হাঁপিয়ে উঠলো। প্রথম প্রথম এরকম আচরণে কিছুটা অবাক লাগতো কিন্তু ক্রমেই যখন একই আচরণে বিদ্ধ হতে থাকতাম তখন মনটা ভীষন খারাপ হয়ে উঠলো, মনে হলো একজন মানুষ কখনও অন্য একজন মানুষকে মূল্য দেয় না, মূল্য দেয় অন্যকিছুর। মূল্য দেয় তার সাজপোশাকের, মূল্য দেয় তার দামী সম্পদের, মূল্য দেয় তার সুন্দর গঠন আর দামী গহনার।
বিষন্নমন নিয়ে হঠাৎ একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। ডিপার্টমেন্টে ছেড়ে চলে গেলাম মেইন কার্জনের ছাঁদে, ছাঁদের একেবারে কিনারায় আমি দাড়ানো আর এক পা সামনে বাড়ানোর জায়গা নেই, নিচে অনেক মানুষ দাঁড়ানো একজনের চোখ পড়তেই সোরগোল বেঁধে গেলে, অনেকে জোর গলায় নেমে আশার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছে। মিনিটখানেকের মধ্যেই বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে খবর রটে গেল, ক্লাস ছেড়ে সবাই দৌড়ে এসে নিচে ভীড় করেছে। আমি মুখ খুলে চিৎকার করে বললাম, “আমি বাঙালি,লুঙ্গি আমার আত্মপরিচয়।”



লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply