অকৃতজ্ঞের নিয়তি

অকৃতজ্ঞের নিয়তি

গল্প, ভৌতিক, রহস্য-রোমাঞ্চ
লেখাটি শেয়ার করুন

হিমেল হিমু।।

 

ছলাৎ ছলাৎ শব্দে মাঝি দাড় বেয়ে যাচ্ছে। আকাশে পুর্ণ চন্দ্রের প্রতিফলনটা নদীর উপর পড়ার কারণে এক অন্য রকম পরিবেশ। কোনো কারণে ট্রলারের শ্যালো ইঞ্জিন কাজ করছে না। তাই বাধ্য হয়ে দাঁড় বাইতে হচ্ছে। অবশ্য পুরো ব্যপারটা রহিম মিয়া বেশ উপভোগ করছেন। ইদানীং কালে দাঁড় বাওয়া নৌকা দূর্লভ বস্তু। যা পাওয়া যায় সব ইঞ্জিন চালিত। ভটভট শব্দে মাথা ধরে যায়।

রহিম মিয়া এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। তার হাত ধরে গ্রামে বেশ কিছু উন্নতি হয়েছে। তার ধারাবাহিকতায় এখন যুক্ত হচ্ছে ফারজানা সুপার মার্কেট। ফারজানা তার বউ এর নাম। তিনি তার বউকে যে খুব ভালোবাসেন তেমন না। তার যত প্রজেক্ট সবগুলো তিনি হয় নিজের নামে নাহলে নিজের পিতার নামে করেছেন। এই নিয়ে তার স্ত্রী একটু মনকষ্টে ভোগার কারণে এবার তার নামে দিচ্ছেন তিনি সুপার মার্কেটের নাম।

সুপার মার্কেটটা হবে কৃষ্ণ নদীর পাড়ে। নদী বললে অবশ্য ভুল হবে। এখন এটা খালের মতোনই বলা যায়। গত কয়েক বছরে যেভাবে নদী ভরাট করা হয়েছে তাতে নদীর গা গতরে আর কিছু নেই৷ আজকে তার অন্তিম পর্ব। এই ফারজানা সুপার মার্কেট নদীর ভরাট করা অংশেই হবে৷

ট্রলারে মানুষ মোটে তিনজন। চেয়ারম্যান রহিম, মাঝি আর রহিমের ডানহাত কুদ্দুস। সারা বিকেল ঝুম বৃষ্টির পর এখন রাত্রে তিনি যাচ্ছেন ভরাট কোথায় হবে তা দেখতে। অবশ্য শুধু মার্কেট দেখলে তিনি যেতেন না। ওই মার্কেটে একটা পার্টি অফিস খোলার কথা ভাবছেন তিনি। জায়গাটা কেমন হবে সে জন্যেই দেখতে যাওয়া মূলত।

ছলাৎ ছলাৎ…. মাঝি এক মনে দাড় বাইছে। চেয়ারম্যান নৌকার মাঝখানে চেয়ার পেতে বসে আছে। কুদ্দুস নৌকার একেবারে শেষ মাথায়। সম্ভবত গাঁজা ধরিয়েছে। কড়া গন্ধে ভরে গেছে চারিপাশ।

হঠাৎ শীত শীত করতে লাগলো রহিমের। সারাদিন বৃষ্টির পর এখন অবশ্য শীত লাগাটা স্বাভাবিক। তবে এই ঠান্ডায় অন্য কিছু একটা আছে। প্রকৃতিতে এমন ঠান্ডা অনুভব করা যায় না। কোনো বদ্ধ স্যাতস্যাতে জায়গায় প্রথমবার ঢুকলে কেমন একটা শীতল ভাব আসে। কবরের মতো…ঠিক অমন লাগছে।

“আরে হইলোডা কী? ” মাঝির প্রশ্নের মাঝে বিভ্রান্তির ছাপ স্পষ্ট।
“ কী হইলো? ” কুদ্দুসের প্রশ্ন।
“চাইরপাশ সাদা কুয়াশায় ভইরা গেছে। ”

এতক্ষণে চারপাশটা চোখ বুলে দেখলো রহিম। সাদা ঘন কুয়াশায় ছেয়ে গেছে চারিপাশ। একটু সামনে দেখার মতোও অবস্থা নেই। এই বর্ষায় এমন কুয়াশার সম্ভাবনা খুবই কম। তবুও রহিম নিজেকে বুঝ দেওয়ার জন্য বললেন

“আরে সারাদিন বৃষ্টি পইড়া চাইরপাশ ঠান্ডা হইয়া গ্যাছে। তাই এহন ঠান্ডায় গরম ভাপ উঠতাছে। এইর লাইগাই মনে হইতাসে কুয়াশা।
“হ, হইতে পারে৷ ” মাঝির কন্ঠে স্পষ্ট অবিশ্বাস।

এই কুয়াশার মাঝে ছলাৎছলাৎ শব্দটাকে মনে হচ্ছে অন্য কোনো জগৎ থেকে আসা আওয়াজ।

প্রকৃতির উপর এত জুলুম করে মানুষ। প্রকৃতি কি কখনো নেবে না এর প্রতিশোধ?

কিছুক্ষণ কুয়াশা থাকার পর ধীরে ধীরেই পরিষ্কার হয়ে গেলো চারিদিক। তবে পরিষ্কার না হলেই সম্ভবত ভালো হতো। নদীর দু’ধারে ঘন গাছপালা। তবে কৃষ্ণ নদীর পুরোটা জুড়ে গত ২০ বছরে এমন গাছপালা ছিলো না। শুধুই বিল্ডিং আর দোকানপাট৷ এ কোথায় এসে পড়েছে তারা?

গাছগুলো যেনো প্রচন্ড মাত্রায় জীবন্ত। চারদিক দিয়ে ঘিরে রেখেছে নৌকাটাকে। যেনো গিলে খেতে চায় তাদের। এখন মনে হচ্ছে গাছের শিকড় গুলো বেড় হয়ে ওগুলো হাঁটা শুরু করবে আর নাগালে পেয়ে যাবে ওদের তিনজনকে।

“কোথায় আইলাম? ” মাঝির ভয়ার্ত প্রশ্ন।
“মনে হয় ভুল কইরা অন্য কোথাও ঢুইকা পড়ছোস। ” কুদ্দুসের উত্তর।
“কিন্তু নদীর তো কোনো অন্য শাখাই নাই সামনে ৬০ মাইল পর্যন্ত। ”
“বানচোত। চুপচাপ নৌকা বা…ভুলভাল দিকে নিয়া আইছোস আবার কথা৷ ” গাজার পিনিক যে ভালোমতোই কুদ্দুসকে ধরেছে তা তার জড়ানোর কন্ঠস্বরেই বোঝা যাচ্ছে।

এই জায়গা টাতে নদীর পানি সত্যিকার অর্থেই তার নামের অর্থে প্রকাশ করছে। নদীর পানি মনে হচ্ছে আলকাতরার মতো কালো৷ পানির নিচে যেনো বাস করছে কোনো প্রাগৈতিহাসিক দানব৷ যে এখনি হা করে গ্রাস করে নেবে নৌকাকে৷

পাশের গাছগুলো এত ঘন যেনো চেপে ধরেছে চারিপাশ দিয়ে সবাইকে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে চেয়ারম্যান রহিম এর। এদের নিজস্ব জায়গায় প্রবেশ করে যেনো তারা মস্ত কোনো অপরাধ করে ফেলেছে। এখন তারা তদারকি করছে তাঁদের উপর। আর কোনো ভুল সোজা মৃত্যু! অথবা মৃত্যুর চাইতেও ভয়ানক কিছু একটা৷

“ভট ভট ভট….” হঠাৎ শব্দ করে ট্রলার চালু হয়ে গেলো। এইতো!  এখনি সব শেষ… আবার তারা আগের জায়গায় ফিরে যাবে৷ কিন্তু না!  আসলে হয়েছে হীতে বিপরীত৷ প্রকৃতির এই বাড়তি অপরাধ আর পছন্দ হয়নি।

কোথা থেকে এক পেঁচা ডেকে উঠলো। পাশ থেকে একটা গাছের গুড়ি সজোরে নৌকার দিকে ছুটে আসলো….থ্যাপ!! গাছের গুড়িটা নদীতে পড়ে গেলো। আর কেমন ফসফস শব্দ হলো।

কোনো বস্তু এসিডে পড়লে যেমন হয়।

চারিদিক নীরব। তবে এরমধ্যে যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে। মাঝির মাথার জায়গায় এখন থেতলানো এক মাংসপিন্ড। রক্তে নৌকা ভেসে যাচ্ছে। সম্ভবত নদীও? প্রকৃতির এই রক্ত হয়তো দরকার ছিলো। কুদ্দুস গাঁজার নেশা ধরে রাখতে না পেরে গভীর ঘুমে। এখন এই অন্য জগতে রহিম একমাত্র জাগ্রত ব্যক্তি। কেনো জানি তার মনে হচ্ছে তার আর মুক্তি নেই এখান থেকে। অপ্রকৃস্থের মতো হাসতে লাগলো সে।

প্রকৃতি অনেক জুলুম সহ্য করেছে। এখন তার হিসাব মেটানোর পালা।

 

||||||||||||||||||||||||||||||||

 

এমন রোবট বোধ হয় এই প্রথম আবিষ্কার হয়েছে। করিম সাহেবের নিজেকে নিয়ে বেশ অহং বোধ হচ্ছে। এই রোবটের বিশেষত্ব হচ্ছে সে একজন মানুষের হুবহু রেপ্লিকা হতে পারবে৷ তবে এর কার্যক্ষমতা হবে মানুষের চেয়ে কয়েক গুণ উন্নত। তবে এর জন্য ওই মানুষের কিছু জিনিস ইনপুট করতে হবে। নিজে কর্ণিয়ার ছাপ, টিস্যু স্যাম্পল আর নিজের ভয়েস। করিম সাহেব পরীক্ষামূলক ভাবে এই রোবটের প্রথম ইউজার হিসেবে নাম লেখাতে চান। দুনিয়াতে তার মতো বিজ্ঞানীর অবশ্যই দু-তিনটে করে থাকা দরকার।

আধঘন্টার মধ্যে করিম সাহেব সব স্যাম্পল যোগাড় করে রোবটের মধ্যে ইনপুট করলো। এখন ৬ ঘন্টা অপেক্ষা শুধু প্রসেসিং এর জন্য। কালকেই আরেক করিম সাহবের দেখা পাবে সে। ফোন করে তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পিএর সাথে কথা বলে নিলো সে। কালকে একটা সংবাদ সম্মোলন করা দরকার। বেশ উত্তেজনা নিয়ে ঘুমাতে গেলেন করিম সাহেব সে রাতে।

পাশের রিডিং টেবিল এর উপর হৃদপিণ্ডটা রাখা। রক্তের কোনো ছাপ নেই অবশ্য। পাশে বিছানায় করিম সাহেবের মৃত দেহটা পড়া। বুকের বাম পাশটায় ছোট্ট একটা ফুটো। সেখান থেকেই হৃদপিণ্ডটা বের করা মূলত। এমন নিখুত অপারেশন কোনো মানুষের পক্ষে করা সম্ভব না।

ক্রিং ক্রিং….

“হ্যালো?  এটা কি মন্ত্রীর কার্যালয়? ”
“জ্বি,হ্যা। বলুন কী বলতে চান৷ ”
“আসলে গতকালকে আমি একটু নেশাগ্রস্ত ছিলাম। কখন কী করেছি মনে নেই। আপনি দয়া করে সংবাদ সম্মেলনের ব্যপারটা ক্যান্সেল করে দিন৷ ”
“আচ্ছা আমি করছি। তবে পরেরবার এমন হলে কিন্তু কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর হ্যা,স্যারকে ম্যানেজ করতে আমার অনেক কথা শুনতে হবে। পারলে কিছু চা নাস্তার ব্যবস্থা কইরেন। ”
“জ্বি,শিওর। ”

এই কথোপকথন এর মাঝে পিএ সাহেব এক মূহুর্তের জন্যেও টের পাননি অপর পাশে ফোনটা করিম সাহেবের বদলে কোনো ধাতব যন্ত্রের হাতে ধরা৷ অবশ্য এই ধাতব যন্ত্রটাই আজ থেকে করিম সাহেব। একজন উন্নত করিম থাকলে অপরজনের দরকার নেই। শুধুই অপচয়…এই চিন্তা থেকে করিম সাহেবের ছোট অপারেশনটা করতে হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার।

মানুষ ধীরে ধীরে প্রযুক্তির বলয়ে গ্রাস হচ্ছে। কিছুদিন পর লড়াই জাতিতে জাতিতে হবে না। মানুষে মানুষে হবে না৷ পরবর্তী লড়াইটা হবে প্রযুক্তি বনাম প্রকৃতির। তবে এই লড়াইয়ে সম্ভবত মানবের অস্তিত্ব থাকবে না। কারণ প্রকৃতি আর প্রযুক্তি কেউ’ই এই অকৃতজ্ঞ বস্তুটাকে চায় না……




লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply